একজন মুমিন(মূর্খ) দাবী করেছেন যে ঋগ্বেদ(১০/২৮/৩) এই মন্ত্রে নাকি গোহত্যা এবং গোমাংস ভক্ষণের কথা বলা হয়েছে!
এই বিষয়টি নিয়েই আজকের লেখা।
প্রথমে কিছু কথা বলে নেওয়া যাক!
তিনি তার প্রিয় ভাষ্যকারের বেদভাষ্য মেনেই এই দাবী করেছেন,যার সংস্কৃত বিষয়ে কিছু মুখস্ত বিদ্যায় কেবল আছে।বেদমন্ত্রের ভাষ্য করতে হলে ভাবশৈলী,ভাষাশৈলী,বিষয়(দেবতা) ইত্যাদি বিষয় লক্ষণীয় আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বেদাঙ্গের ব্যবহার।
অনুরোধঃলেখাটি সম্পূর্ণ পড়বেন।
তার লেখা পোষ্টটি দেখা যাক,
তিনি যে রেফারেন্স দিয়েছেন সেইগুলোও বিচার করা হবে।
রেফারেন্সগুলো দেখে আসি—
★(১) মন্ত্রঃপচস্তি তে বৃষভা অৎসি তেষাম।ঋগ্বেদ(১০/২৮/৩)
★(২)পচস্তি=রান্না করা।নিরুক্ত(১/১/১/১২)
★(৩)তে=তাহারা।নিরুক্ত(১/১/৪/২)
★(৪)বৃষভা=ষাঁড় গরু।নিরুক্ত(৯/২২/১;৯/২৩/১,৫)
★(৫)বৃষস্যতি গৌ।অষ্টাধ্যায়ী(৭/১/৫১)
★(৬)অষ্টাধ্যায়ীর "গৌ" মানে গরু।নিরুক্ত(১/১/১/১৫)
★(১)—মন্ত্রঃপচস্তি তে বৃষভা অৎসি তেষাম।ঋগ্বেদ(১০/২৮/৩)
উক্ত মন্ত্রে গোমাংস ভক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
সমাধানঃ
মূল মন্ত্রটি দেখা যাক,
অদ্রি॑ণা তে ম॒ন্দিন॑ ইন্দ্র॒ তূয়া॑ন্ত্সু॒ন্বন্তি॒ সোমা॒ন্পিব॑সি॒ ত্বমে॑ষাম্ ।
পচ॑ন্তি তে বৃষ॒ভাঁ অৎসি॒ তেষাং॑ পৃ॒ক্ষেণ॒ যন্ম॑ঘবন্হূ॒য়মা॑নঃ ॥
সংস্কৃতঃ—
পদার্থঃ(ইন্দ্র)হে আত্মন্!রাজন্!বা(তে)তুভ্যম্ (অদ্রীণা) শ্লোককৃতা প্রশংসকেন বৈদ্যেন পুরহিতেন বা প্রেরিতা অদ্রিরসি শ্লোককৃৎ{কাঠ.(১/৫)} (মন্দিনঃ) তব হর্ষযিতারঃ পারিবারিকা জনা রাজজর্মচারিনো বা (তুয়াৎ সোমান্ সুন্বন্তি) জলময়ান্ রসময়ান্ "তুযম্ উদকনাম"{নিঘ.(১/১২)} সোমরসান্ সম্পাদয়ন্তি (তেষাম্ ত্বম্ পিবসি) তান্ ত্বম্ পিবেঃ লিঙর্থে লেট্{অষ্টাধ্যায়ী(৩/৪/৭)} অথ (তে) তুভ্যম্ (বৃষভান্ পচন্তি) সুখরসবর্ষকান্ বৃষভঃ যো বর্ষতি সুখানি সঃ{ঋগ্বেদ(১/৩১/৫)} বৃষভঃ বর্ষিতাঽপাম্{নিরুক্ত(৩/৮)} সম্পাদয়ন্তি (মঘবন্) পৃক্ষেণ (হুয়মানঃ) হে আত্মন্ রাজন্!বা স্নেহসম্পর্কেণাহুয়মানো নিমন্ত্র্যমাণঃ (তেষাম্ -অৎসি) তান্ ত্বম্ (ভুঙ্ক্ষ্ব-ভুঙ্ক্ষে)॥
বাংলাঃ—
পদার্থঃ(ইন্দ্র) হে আত্মন্ বা রাজন্!(তে) আপনার জন্য (অদ্রিণা) প্রশংসিত বৈদ্য অথবা পুরোহিত দ্বারা প্রেরিত (মন্দিনঃ) আপনাকে প্রসন্ন করা পারিবারিক ব্যক্তি বা রাজকর্মচারী (তুয়াৎ সোমান্ সুন্বন্তি) রসময় সোম তৈরী করে (তেষাম্ ত্বম্ পিবসি) তাকে পান কর এবং (তে) আপনার জন্য (বৃষভান্ পচন্তি) সুখবর্ষণকারী সুখকে তৈরী করে (মধবন পৃক্ষেণ হুয়মানঃ)হে আত্মন্!বা রাজন্!স্নেহ সম্পর্ক দ্বারা নিমন্ত্রিত করা হয়েছে (তেষাম্-অৎসি) এটিকে আপনি ভোগ করুন।
ভাবার্থঃআত্মা যখন শরীরে প্রবেশ করে তখন সেটিকে অনুমোদিত করা বৈদ্য এবং প্রশংসনীয় করা পারিবারিক জন অনেক রসালো এবং ভোগ্য পদার্থ সেটির জন্য তৈরী করে এবং স্নেহভরে খাওয়া এবং পান করায়।যা দ্বারা শরীর পুষ্টির দিকে এগিয়ে যায় অর্থাৎ রাজা রাজপথে বিরজিত থাকেন।তখন তাহার প্রশংসক পুরোহিত এবং প্রসন্নকারী রাজকর্মচারী সোমাদি ঔষধির রস এবং ভোগ্যাদি তৈরী করে রাখে।সেই স্নেহ দ্বারা আদর পেয়ে উনার সেবা করে।
★★উপরোক্ত মন্ত্রটিতে জীবাত্মার শরীর ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে।যা এই সুক্তের ১নং মন্ত্র থেকেই লক্ষ্যণীয়!কিন্তু মূর্খরা নিজেদের চরিতার্থ প্রকাশ করতে গিয়ে ভিন্ন অর্থ করে ফেলেছে।
তারা লিখেছেন—পচস্তি তে বৃষভা অৎসি তেষাম
★★★এটি ভূল লিখেছে,"পচন্তি" এর জায়গায় "পচস্তি" এবং "বৃষভান্" এর জায়গায় বৃষভা লিখেছে।এখানে "বৃষভাঁ" পদটি সন্ধি হওয়ার কারণে এভাবে লেখা হয়েছে,মূল পদ হবে "বৃষভান্"!
"বৃষবান্" যা কর্মকারকে ২য়া বিভক্তি বহুবচন হয়।
★(২)—"পচস্তি" এর অর্থ "রান্না করা"! নিরুক্ত(১/১/১/১২),অমরেশ্বর ঠাকুর
সমাধানঃ
যদিও এখানে " পচন্তি" হবে!অমরেশ্বর ঠাকুর কি এই সূত্রে "পচন্তি" এর অর্থ করেছেন?"পচতি" এবং "পচন্তি" "পচ্" ধাতু থেকে আসলেও এখানে বচনের পার্থক্য আছে।"পচতি" প্রথম পুরুষে একবচনে ব্যবহৃত হয় আর "পচন্তি" বহুবচনে।
★★নিরুক্ত(৬/১৬) অনুসারে দ্বিবচনে কখনো "পচত" পশু অর্থে ব্যবহৃত হবে না।
আবার অমরেশ্বর ঠাকুর উনার নিরুক্তভাষ্যে "বৃষভ" অর্থ বর্ষণকারী মেনেছেন।
দেখুনঃনিরুক্ত(৪/৮/২),অমরেশ্বর ঠাকুর
★★★ঋগ্বেদ(১০/২৮/৩,৪) নং মন্ত্রে সোমের কথাও এসেছে যার অর্থ অমরেশ্বর ঠাকুর গাভীর দুগ্ধই মেনেছেন।
দেখুনঃনিরুক্ত(৫/৩/৪),অমরেশ্বর ঠাকুর।
★৩)—"তে" অর্থ তাহারা।নিরুক্ত(১/১/৪/২)
সমাধানঃ
অমরেশ্বর ঠাকুর এখানে "তে" শব্দটি জন্মাদি শব্দবাচ্য ভাববিকারের জন্য লিখেছেন।আবার এই একই সূত্রের(যদিও নিরুক্তে খণ্ড হয়) ব্যাখ্যাতে নিজেই মেনেছেন "পচতি" অর্থ নরম হওয়াও বোঝায়।"তে" বহুবচন হওয়ায় "পচন্তি" হবে।
★(৪)—"বৃষভা"=ষাঁড় গরু।নিরুক্ত(৯/২২/১;৯/২৩/১,৫)
সমাধানঃ
★★প্রথমেই দেখি অমরেশ্বর ঠাকুর কি লিখেছেন!
বৃষভঃ প্রাং বর্ধতীতি বাতিবৃহতি রেত ইতি বা তদ্ বৃষকর্ম্মা বর্ষণাৎ
বৃষভঃ ॥ ১ ॥
বৃষভঃ প্রজাং বর্ধতি ইতি বা ( প্রজার অর্থাৎ সন্তানের উৎপত্তিকারণ রেতঃ বর্ষণ করে )
অতিবৃহতি রেতঃ ইতি বা (অথবা, রেতঃসেক করিতে নিজেকে অত্যন্ত উদ্বৃত করে),
কৰ্ম্মা (এতাদৃশ বৃষের কর্মসদৃশ কর্ম্ম যাহার সেও) বর্ষণাৎ বৃষভঃ ( বর্ষণক্রিয়া হেতু
বৃষ বলিয়া অভিহিত হয়)।
অশ্বার্থক ‘বৃষভ' শব্দের নির্ব্বচন প্রণিত হইতেছে। (১) বর্ষণার্থক ‘বৃষ' ধাতু হইতে
'বৃষভ"' শব্দ নিষ্পন্ন (উ ৪.৩ দ্রষ্টবা) - অশ্ব প্রার্থ বড়বাযোনিতে রেতঃসেক করে।
(২) উত্থমনার্থক 'বৃহ' ধাতু হইতে নিষ্পন্ন -অশ্ব রেতঃসেক করিবার নিমিত্ত নিজেকে অত্যন্ত
উদ্ধৃত করে। গোবাচী ‘বৃষভ" শব্দও বর্ষণার্থক ‘বৃষ' ধাতু হইতেই নিষ্পন্ন-পুংগো (ষাঁড়)
অশ্ববৃষের ন্যায় রেতঃসেক করে, অশ্ববৃষের কর্মসদৃশ ইহার কর্ম্ম।
★★★(৯/২২/১) এর ব্যাখ্যায় তিনি কি মেনেছেন ঋগ্বেদ(১০/২৮/৩) মন্ত্রের "বৃষভ" পদের অর্থ "ষাঁড় গরু" হবে?উনি নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।যদি তা হয় তবে একই মন্ত্রে উল্লেখিত "সোম" পদটি দ্বারা তিনি গাভীর ক্ষরিত দুগ্ধকে নির্দেশ করবেন।কেন না (৫/৩/৪) এ "সোম" অর্থ তিনিই তা মেনেছেন।মান্যতা এমন হলে মূল কর্তা অর্থাৎ "তে" ধরা হয় তবে কর্তা অনুসারেই ক্রিয়া পরিবর্তীত হবে।
নিরুক্ত(৯/২৩/১) এ তিনি ঋগ্বেদ(১০/১০২/৫) এর ব্যাখ্যা করেছেন।অন্য মন্ত্রের ব্যাখ্যা ঋগ্বেদ (১০/২৮/৩) কে কেন প্রয়োগ হবে আর নিরুক্ত(৯/২৩/৫) এ "বৃষভ" পদটিই নেই আছে "গবাং" যা দ্বারা নিরুক্ত(৯/২৩/১) এ অমরেশ্বর ঠাকুর "গাভী" অর্থ করেছেন।
★(৫)—বৃষস্যতি গৌ।অষ্টাধ্যায়ী(৭/১/৫১)
সমাধানঃ
★★প্রথমেই অষ্টাধ্যায়ীর সূত্রটি দেখা যাক—
এখানে কি বলা হয়েছে তা মুমিন(মূর্খ) বুঝেছে কি না তাও সন্দেহ!
★(৬)—অষ্টাধ্যায়ীর "গৌ" মানে গরু। নিরুক্ত(১/১/১/১৫)
সমাধানঃ
★★অমরেশ্বর ঠাকুর কি এটা লিখেছেন?সূত্রে কোথায় অষ্টাধ্যায়ীর উল্লেখ আছে?
নিজেই দেখুন—
বিচারঃ
মূর্খতার একটা সীমা থাকা দরকার এক মন্ত্রের ব্যাখ্যা অন্য মন্ত্রে প্রযোজ্য তখনই হবে যখন সেটি ব্যাকরণ দ্বারা সিদ্ধ হবে।কোন জায়গায় একটা শব্দের অর্থ পেলেই সেটা বেদমন্ত্রে ব্যবহার করে ভাষ্য করে ফেললেই হয় না।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
আমরা অমরেশ্বর ঠাকুরের নিরুক্ত ভাষ্যকে প্রামাণ্য মানি না,কেবল মিথ্যাচারগুলো তুলে ধরার জন্য উনার ভাষ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সত্যমেব জয়তে
ISDPA










No comments:
Post a Comment