Thursday, 29 February 2024

"ইন্দ্র দ্বারা পর্বত নাশ" এ কথার প্রকৃত রহস্য উম্মোচন

 



"ইন্দ্র দ্বারা পর্বত নাশ" -উক্তিটির প্রকৃত রহস্য উম্মোচন!

ঋগ্বেদ (১.৩২.১) মন্ত্রে আমরা ইন্দ্র কতৃক পর্বত নাশের কথা দেখতে পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই পর্বত কি পৃথিবীপৃষ্ঠে থাকা হিমালয়, এভারেস্ট এজাতীয় পর্বতমালাকে বোঝাচ্ছে? আর ইন্দ্র বলতে কি পুরাণকাহিনীতে বর্ণিত স্বর্গের দেবতা ইন্দ্রকে বোঝানো হচ্ছে? উত্তর হচ্ছে, না। বেদে কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইতিহাস থাকে না যেটা বলা হয়েছে মীমাংসা দর্শন (১.১.৩১) এ। 



বৈদিক শাস্ত্রে পর্বত শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। নিঘন্টু (১.১০) এ বলা হয়েছে - পর্বত হলো মেঘের নাম।



 আধিদৈবিক পক্ষে ইন্দ্র শব্দে সূর্য, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বোঝানো হয়। তাই ইন্দ্র দ্বারা পর্বত নাশ বলতে বোঝায় সূর্য কতৃক মেঘকে বিদীর্ণ করে বৃষ্টির সৃষ্টি।

পণ্ডিত জয়দেবশর্মাজীও "ইন্দ্র" শব্দের অর্থ বায়ু এবং বিদ্যুৎ করেছেন এবং "পর্বতানাম্" শব্দের অর্থ পর্বত এবং মেঘ করেছেন।



 আবার হরফ প্রকাশনীর সামবেদ ১২৪৭ নং মন্ত্রে ইন্দ্র = সূর্য বা বিদ্যুৎ - গ্রহণ করা হয়েছে।। 




ঋগ্বেদ (১.৩২.১) মন্ত্রটি দেখা যাকঃ-


ও৩ম্ ইন্দ্রস্য নু বীর্য়াণি প্র বোচং য়ানি চকার প্রথমানি বজ্রী। অহন্নহিমন্বপস্তর্দ প্র বক্ষণা অভিনত্ পর্বতানাম্।।১।।

পদার্থঃ হে বিদ্বান মনুষ্য! তোমরা যেমন (ইন্দ্রস্য) সূর্যের (য়ানি) যে (প্রথমানি) প্রসিদ্ধ (বীর্য়্যাণি) পরাক্রমকে বলে, তাহাকে আমিও (নু প্রবোচম্) দ্রুত বলিব, যেরূপ সে (বজ্রী) সমস্ত পদার্থের ছেদনকারী কিরণ দ্বারা যুক্ত সূর্য (অহিম্) মেঘকে (অহন্) হরণ করিয়া বর্ষণ করেন ওই মেঘের অবয়ব রূপ (যে প্রকার জল কণা নিম্নে-উর্ধ্বে (চকার) করেন, তাহাকে (ততর্দ) পৃথিবীতে পতিত করেন এবং (পর্বতানাম্) ওই মেঘ ও মেঘের সন্নিহিত হইতে (প্রবক্ষাণঃ) নদীকে ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া প্রবাহিত করে। ঐরূপ (অভিনত্) আমি শত্রুকে মারিব, তাহার এদিক-ওদিক ছুড়ে ফেলিব এবং তাহার তথা দূর্গ আদি স্থান হইতে যুদ্ধ করিবার জন্য আসন্ন সেনাকে ছিন্ন-ভিন্ন করিব।।১।।

ভাবার্থঃ এই মন্ত্রে উপমালঙ্কার আছে। ঈশ্বরের উৎপন্নকৃত এই অগ্নিময় সূর্য্যলোক যেরূপ নিজের স্বভাবিক গুণযুক্ত অন্নাদি, প্রকাশ, আকর্ষণ, দাহ, ছেদন এবং বর্ষার উপত্তির নিমিত্ত কার্যকে দিন রাত করেন, ঐরূপ যে প্রজার পালনে তৎপর রাজপুরুষ আছে, তাহাকেও নিত্য করা উচিত।।১


ভাষ্যকারঃ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী





প্রমাণ -

 ১. পর্বত ইতি মেঘনামসু পঠিতম (নিঘ০ ১.১০)

২. অহিরিতি মেঘনামসু পঠিতম্। (নিঘ০ ১.১০)


বেদে এভাবেই উপমাবাচী যুদ্ধের কথা বর্ণনা করার মাধ্যমে প্রাকৃতিক বা আধ্যাত্মিক তত্ত্বকে তুলে ধরেন।

 যা মহর্ষি যাস্ক তার নিরুক্তে নির্বচন করেছেন -

অপাং চ জ্যোতিষশ্চ মিশ্রীভাবকর্ম জায়তে ত্রোপমার্থেন যুদ্ধবর্ণা ভবস্ত্যহিবত্তু খলু মন্ত্রবর্ণাব্রা হ্মণবাদাশ্চ বিবৃদ্ধ্যা শরীরস্য স্রোতাংসি নিবারয়াঞ্চকার তস্মিন্ হতে প্রসস্যন্দিরে আপস্তদভিবাদিন্যেষর্গ্ ভবতি।।১০।।

নিরুক্ত (২.১৬.১০)

অর্থাৎ বৃত্র মেঘ ব্যতীত আর কিছুই নহে - নিরুক্তকারগণের এই মতই সমীচীন বলিয়া মনে করেন। প্রশ্ন হইতে পাড়ে বৃত্র যদি মেঘ হয়, তাহা হইলে বৃত্রের সহিত ইন্দ্রের যে বর্ণনা তাহা রূপকমাত্র। মেঘরূপী জল ও বিদ্যুতের মেলন বা সংঘর্ষ হইতে বৃষ্টি উৎপন্ন হয় - মেঘরূপী জল অর্থাৎ মেঘই বৃত্র এবং বিদ্যুতই ইন্দ্র ; মেঘ এবং বিদ্যুতের সংঘর্ষই বৃত্র এবং ইন্দ্রের যুদ্ধ।।



১. "বৃত্রঃ ইতি মেঘনাম" (নিঘন্টু ১.১০)



★বেদের এই তথ্যটিকেই হয়তো পরবর্তীতে পুরাণ কাহিনীতে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে যেমনঃ পুরাকালে পর্বতসমূহ পাখির মতো উড়ে বেড়াত (কারণ মেঘ যেহেতু পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়ায়) ও ইন্দ্র সেগুলোর পক্ষচ্ছেদ করেন এরূপ। 

★★ রামায়ণে প্রক্ষেপ আছে। রামায়ণের প্রক্ষিপ্ততা নিয়ে পরবর্তী কোনো পর্বে আলোচনা করবো।। 


নমস্কার,

"সত্যমেব জয়তে"

★ISDPA★





Tuesday, 20 February 2024

এক্স হিন্দু(নও মুসলিম) এর দাবী খণ্ডন এবং কুরআনের রচয়িতার সন্ধান।



 নমস্তে সকলকে,

 বিষয়ঃএক্স হিন্দু(নও মুসলিম) এর দাবী খণ্ডন এবং কুরআনের রচয়িতার সন্ধান।

একজন এক্স হিন্দু(নও মুসলিম) দাবী করেছেন যে,"বেদ নাকি ঋষিরা তাদের শিষ্যদের দিয়ে নির্মান করতেন অর্থাৎ বেদ মনুষ্যকৃত গ্রন্থ"।

চলুন দেখি সেই নও উম্মতের দাবীটা,


তার দাবী কতটুকু সত্য সেটা প্রমাণ করা হবে।যখন কারো গোমাংস খাওয়ার লোভ জাগে এবং খাওয়ার পর উত্তেজনায় ৭২ হুরকে স্বপ্নে দেখে সে অবশ্যই নবীর উম্মত হবেই।

খণ্ডনঃ

প্রথমেই মূল মন্ত্রটি দেখা যাক,

ঋষিঃ—কণ্বো ঘৌরঃ।। দেবতা—মরুতঃ।। ছন্দঃ—য়বমধ্যাবিরাগায়ত্রী।। স্বরঃ-ষড়জঃ।।

[পুনঃ সে বিদ্বান কর্তৃক শিক্ষা স্বাধ্যায় প্রাপ্ত শিষ্য কেমন হওয়া উচিত, এই বিষয়ে উপদেশ মন্ত্রে করা


ও৩ম্ মিমীহি শ্লোকমাস্যে পর্জন্য ইব ততনঃ।

গায় গায়ত্রমুক্থ্যম্।। ১৪৷৷


পদার্থঃ হে বিদ্বান মনুষ্য! তুমি (আস্যে) নিজের মুখে (শ্লোকম্) বেদের শিক্ষা দ্বারা যুক্ত বাণীকে (মিমীহি) নির্মাণ কর এবং সেই বাণীকে (পর্জন্য ইব) যেরূপ মেঘ বৃষ্টি করে, ঐরূপ (ততনঃ) বিস্তৃত (উত্থ্যম্)এবং করিবার যোগ্য, (গায়ত্রম্) গায়ত্রী ছন্দযুক্ত স্তোত্ররূপ বৈদিক সূক্তকে (গায়) শ্রবণ তথা শ্রাবণ কর।। ১৪।।

সরলার্থঃ হে বিদ্বান মনুষ্য! তুমি নিজের মুখে বেদের শিক্ষা দ্বারা যুক্ত বাণীকে নির্মাণ কর এবং সেই বাণীকে যেরূপ মেঘ বৃষ্টি করে, ঐরূপ বিস্তৃত এবং করিবার যোগ্য, গায়ত্রী ছন্দযুক্ত স্তোত্ররূপ বৈদিক সূক্তকে পঠন তথা পাঠন কর।। ১৪।।

ভাবার্থঃ এই মন্ত্রে উপমাপলঙ্কার আছে। হে বিদ্বান হইতে বিদ্যা স্বাধ্যায় করিয়া মনুষ্য! তোমাদের উচিত যে, সব প্রকার প্রযত্নের সহিত বেদবিদ্যা দ্বারা শিক্ষিত হইয়া বেদবাণী হইতে বাণীর বেত্তার ন্যায় বক্তা হইয়া বায়ু আদি পদার্থের গুণের স্তুতি তথা উপদেশ কর।। ১৪।।



ভাষ্যকারঃমহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী।

উপরোক্ত মন্ত্রে উপমালঙ্কার বোঝানো হয়েছে।শিষ্য গুরু হতে বেদমন্ত্র আয়ত্ব করে গুরুর মত বিদ্বান হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।একটু লক্ষ্য করুন,"তুমি নিজের মুখে বেদের শিক্ষা দ্বারা যুক্ত বাণীকে নির্মাণ কর" অর্থাৎ বেদ হতে শিক্ষা লাভ করে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন জ্ঞান উৎপন্ন কর।এখানে বেদের শিক্ষা দ্বারা যুক্ত বাণীকে উৎপন্ন করতে বলা হয়েছে বেদকে বা বেদমন্ত্রকে নয়!বেদ হতে শিক্ষা নিচ্ছেন শিষ্য তার মানে বেদ এর আগেই ছিল,না হলে শিক্ষা নিবে কোথা থেকে?


★★

বিষয়ঃবেদবানীর স্মরণ এবং গান

পদার্থঃ

১.(শ্লোকম্)- প্রভূর গুণগানকারী এই বেদবাণীসমূহকে (আস্যে মিমীহি)-মুখে নির্মিত করে নাও অর্থাৎ এগুলোকে কণ্ঠস্থ করে নাও।

২. (পর্জন্যঃ ইব ততনঃ) মেঘ এর সমান(গম্ভীর স্বর দ্বারা দূর-দূর পর্যন্ত গর্জন করে)ইহাকে প্রকাশ কর। 

৩.(গায়ত্রম্) গায়ত্রী ছন্দে বলা হয়েছে অথবা গানকারীর  ত্রাণ করা (উক্ষ্যম্) স্তুতিযুক্ত বেদবচনগুলোকে (গায়)-তুমি স্বয়ম্ গাও।

৪.কণ্ঠস্থ করে সর্বধা বাক্যের বিস্তার এবং গাওয়ার স্বাভবিক পরিণাম হয় এই যে আমাদের সামনে জীবনের লক্ষ্য সর্বধা উপস্থিত থাকে।এই লক্ষ্য-দৃষ্টি আমাদের মার্গভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে।সেই গায়ত্রী ছন্দের মন্ত্রগুলো গাওয়ার যোগ্য।

 ভাবার্থঃআমরা বেদবাণীকে কণ্ঠস্থ করবো,ইহার বিস্তার এবং গান করবো।



ভাষ্যকারঃহরিশরণ সিদ্ধান্তলংকার।

উপরোক্ত মন্ত্রে বেদবাণীকে কণ্ঠস্থ করার কথা বলা হয়েছে,কিন্তু মুমিন(মূর্খ) যে দাবীটা করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এবার আমরা দেখি "কুরআন" কি আল্লাহ্ নামক কোন সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান স্রষ্টার বাণী?

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

অনুবাদঃপরমকরুণাময় মেহেরবান আল্লাহ্ এর নামে।


সুরাঃফাতিহা,আয়াতঃ১

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ হচ্ছে "প্রথম পুরুষ" কারণ যাকে উদ্দশ্য করে বলা হয় তিনি হলেন "প্রথম পুরুষ"।(কর্তা) হয় "উত্তম্ পুরুষ"! কারণ,"আমি" এটি উত্তম্ পুরুষেই হয়।বাক্যটি তখনই কোন স্রষ্টার হত যদি তিনি বলতেন-আমি বলছি তুমি বলো,"আল্লাহ্ এর নামে" অথবা "আমার নামে"!

তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে,কুরআনের প্রথম আয়াতটি আল্লাহ্ এর নয় বরং অন্যকোন সত্ত্বার!কারণ,সেই আয়াতে কোন উত্তম্ পুরুষ বা আমি,সর্বনামের ব্যবহার করা হয় নি।

এবার আরও একটি বিষয় দেখা যাক,

সুরাঃআল-হিজর,আয়াতঃ৯৪ এ বলা হয়েছে,

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَ اَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِیْنَ

অনুবাদঃ হে নবী! তোমাকে যে বিষয়ের হুকুম দেয়া হচ্ছে তা সরবে প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং শিরককারীদের মোটেই পরোয়া করো না। 



পয়েন্টঃউপরোক্ত আয়াতটি নবীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে এবং (৯৪-৯৯) আয়াতগুলোও নবীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।কিন্তু,বড়ই কিন্তু সুরা আন্-নহলের প্রথম আয়াতটিতে দেখা যায় অন্যকেউ আল্লাহ্ এর কথা বলছেন।চলুন সেটি দেখা যাক—

اَتٰۤى اَمْرُ اللّٰهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوْهُ١ؕ سُبْحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰى عَمَّا یُشْرِكُوْنَ

অনুবাদঃএসে গেছে আল্লাহর ফায়সালা। এখন আর একে ত্বরান্বিত করতে বলো না। পবিত্র তিনি এবং এরা যে শিরক করছে তার ঊর্ধ্বে তিনি অবস্থান করেন।



পয়েন্টঃসুরা আন্-নহলের প্রথম আয়াতে আবার আল্লাহ্ কে প্রথম পুুরুষে ব্যবহার করা হয়েছে।অথচ এর আগের সুরার শেষ ৬ টি আয়াতে আল্লাহ্ ছিলেন উত্তম্ পুরুষ!বাহ্ বাহ্

এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে,সুরাঃআল-হিজরের পরের সুরাটি কি সুরাঃআন্-নহল?যদি না হয় তাহলে কুরআন সঠিকভাবে সংকলন করা হয় নি।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

"কুরআন" কোন সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান স্রষ্টার গ্রন্থ নয়।

নমস্তে,

"সত্যমেব জয়তে"

★ISDPA★

Wednesday, 14 February 2024

বেদে কি সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের বিধান দেওয়া হয়েছে?



  বেদে কি সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের বিধান দেওয়া হয়েছে?

ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৮) মন্ত্রে কি সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের বিধান দেওয়া হয়েছে? 


একদল স্বল্পজ্ঞানী বিধর্মীর দাবি ঋগ্বেদের উক্ত মন্ত্রে সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের কথা বলা হয়েছে। আসুন তাদের এরূপ ভুল ধারণার নিবারণ করা যাক। ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৮৭ নং সূক্তের মন্ত্রগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যেসকল অত্যাচারীরা বা যাতনাধারকেরা মানুষ হত্যা করে, অশ্বদিগকে হত্যা করে, গো আদি পশুকে হত্যা করিয়া তাদের মাংস ভক্ষণ করে নিজের শরীর পুষ্ট করে পাশাপাশি গাভীর দুগ্ধ হরণ করে, দূষণ ও নষ্ট করে তাদেরকে গাভীর দুগ্ধ নয় বরং গাভীর মূত্র তথা বিষ ভক্ষণ করতে বলেছে। আর যারা অত্যাচারী নয়, মানুষ, অশ্ব ও গো আদি পশুকে হত্যা করে না, গাভীর দুগ্ধ নষ্ট করে না তাদের গাভীর উত্তম দুগ্ধ পান করতে বলেছে। ঋগ্বেদ ১০ মণ্ডল ৮৭ তম সূক্তের ১৫ থেকে ২০ নং মন্ত্রের অনুবাদ তুলে দেওয়া হলো অপপ্রচারকদের উপস্থাপিত স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক জীর ভাষ্য হতে -

প্রথমেই সুক্তের ১নং মন্ত্রটি দেখা প্রয়োজন।

🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১)

সূক্তটির‌ বিষয়‌ বস্তু‌: এই সূক্তে রাষ্ট্রধ্বংসক শত্রুদের তথা প্রজাপীড়কদের বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্রের দ্বারা নাশ করার বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

রক্ষোহণং বাজিনমা জিঘর্মি মিত্রং প্রথিষ্ঠমুপ যামি শর্ম। 

শিশানো অগ্নিঃ ক্রতুভিঃ সমিদ্ধঃ স নো দিবা স রিষঃ পাত নক্তম্।।১।।

পদার্থঃ (রক্ষোহণং বাজিনম) যার থেকে রক্ষা করা উচিত, সেই রাক্ষস স্বভাবযুক্ত পাপী শত্রুকে যে হত্যা করে, সেই বলবান (মিত্রং প্রথিষ্ঠং জিঘর্মি) অস্ত্রপ্রেরক অতিশক্তিপ্রসারক আগ্নেয়াস্ত্রযুক্তকে আমি রাজা দীপ্ত করেছি, প্রবুদ্ধ  করেছি‌, জ্ঞনোপদেশ‌ প্রদান‌ করছি‌ (শর্ম-উপ যামি) এরূপ করে সুখকে প্রাপ্ত হই (সঃ) সেই (শিশানঃ-অগ্নিঃ) তীক্ষ্ণ বলবিশিষ্ট অগ্রণী সেনানায়ক (ক্রতুভিঃ-সমিদ্ধঃ) যিনি বিবিধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগের দ্বারা সংসিদ্ধ (নঃ) আমাদের (সঃ-রিষঃ-দিবানক্তং পাতু) সেই হিংসক শত্রু হতে দিন-রাত রক্ষা করার মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখুক।।১।।

ভাবার্থঃ রাজার এমন সেনানায়ক তৈরি করা উচিত, যে শত্রুকে দমন ও বধ করতে পূর্ণ সমর্থ আগ্নেয়াস্ত্র প্রভৃতি চালনাকারী হয়।

এবার এই সুক্তের অর্থাৎ (১০/৮৭) সুক্তের (১৫-২০) নং মন্ত্র পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেখা যাক—

🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৫)

পরাদ্য দেবা বৃজিনং শৃণন্তৃ প্রত্যগেনং শপথা যন্তু তৃষ্টাঃ।

বাচাস্তেনং শরব ঋচ্ছন্ত মর্মন্বিশ্বস্যৈতু প্রসিতিং যাতুধানঃ।।১৫।।

পদার্থঃ (দেবাঃ) বিজয়াভিলাষী যুদ্ধকুশল স্বপক্ষীয় সৈনিকজন বা বৈদ্যুতিক রশ্মি পদার্থ অস্ত্রপ্রযুক্ত (বৃজিনম্-অদ্য পরা শৃণন্তু) অন্যদের প্রাণসংহারকারী পাপীদেরকে শীঘ্রই নষ্ট করো (তৃষ্টাঃ-শপথাঃ-এনং প্রত্যক্-এতু) প্রাণপোষক অহিতকর প্রলাপ ঐ পাপীর দিকেই গমন করুক বা তাকেই আঘাত করুক (শরবঃ) হিংসক বাণ (বাচা স্তেনং-মর্মন্-ঋচ্ছন্তু) বাণীর দ্বারা অপহরণকর্তার মর্মস্থান প্রাপ্ত হোক (যাতুধানঃ-বিশ্বস্য প্রসিতিম্-এতু) অত্যাচারী সমগ্র রাষ্ট্রের বন্ধনকে প্রাপ্ত হোক।।১৫।।

ভাবার্থঃ সৈনিকজন বা অস্ত্রে প্রযুক্ত বিদ্যুৎ আদি পদার্থ পাপীকে নষ্ট করুক, অপরের প্রতি [উচ্চারিত] মর্মভেদী অপশব্দ উল্টো তাকেই নাশ করুক, সমগ্র রাষ্ট্রের পীড়াদায়ক বন্ধনে তাকে পতিত করা হোক৷।১৫।।


🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৬)


যঃ পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা সমংক্তে যো অশ্ব্যেন পশুনন যাতুধানঃ।

যো অঘ্ন্যায়া ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ।।১৬।।

পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (যঃ-যাতুধানঃ) যেসকল অত্যাচারী দুষ্ট প্রাণী (পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা) মানুষের অভ্যন্তরীণ মাংসের দ্বারা (সমঙক্তে) নিজেকে পুষ্ট করে (যঃ-অশ্ব্যেন পশুনা) যে পশুদের মধ্যে সাধু পশুদের দ্বারা নিজেকে সম্যক পুষ্ট করে (যঃ-অঘ্ন্যায়াঃ ক্ষীরং ভরতি) যে অহন্তব্য বা হত্যার অযোগ্য গাভীর দুগ্ধ হরণ করে-দূষিত করে (তেষাং শীর্ষাণি হরসা বৃশ্চ) তাহার  মস্তককে বা তাহার মস্তকতূল্য বর্তমান প্রমুখজনদিগকে হরণকারক অস্ত্র-শস্ত্র সাধন দ্বারা ছিন্নভিন্ন করো, নষ্ট করো।।১৬।।

ভাবার্থঃ তেজস্বী নায়কের উচিত রাষ্ট্রতে, যে পীড়া প্রদানকারী প্রাণী মানুষের মাংস ভক্ষণ করে নিজেকে পুষ্ট করে বা উত্তম অশ্বদের নষ্ট করে, গাভীর দুগ্ধ হরণ করে, দূষিত করে, তাদের মস্তক এবং তার প্রমুখজনদেরকে নষ্ট করো ।।১৬।।


🔰ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৭)


সংবৎসরীণং পয় উস্রিয়ায়াস্তস্য মাশীদাত্যাতুধানো নৃচক্ষঃ।

পীয়ুষমগ্নে যতমস্তিতৃপ্সাত্তং প্রত্যঞ্চমর্চিষা বিধ্য মর্মন্।।১৭।।

পদার্থঃ (নৃচক্ষঃ-অগ্নে) হে মনুষ্যের কর্মদ্রষ্টা নায়ক! (যাতুধানঃ) পীড়াদায়ক দুষ্ট মনুষ্য (উস্রিয়ায়াঃ-সংবৎসরীণং তস্য পয়ঃ) গাভীর সেই দুগ্ধকে বর্ষপর্যন্ত-পুরো বর্ষ জুড়ে (মা-অশীৎ) যেন পান করতে না পারে, এরূপ দণ্ড তাকে দেও (পীয়ুষং যতমঃ-তিতৃপ্সাৎ) সেই অমৃতরূপ দুগ্ধের দ্বারা যে [পীড়াদায়ক মনুষ্য] নিজেকে পুষ্ট করতে প্রয়াসী হয়, (তং প্রত্যঞ্চম্) তাকে সকলের প্রত্যক্ষ-সম্মুখে (অর্চিষা মর্মন্ বিধ্য) জ্বলন্ত শিখাদ্বারা তার মর্ম বিদ্ধ করে-তাড়িত করো।।১৭।।

ভাবার্থঃ সকলের আচার-ব্যবহার রূপ কর্মের দ্রষ্টা নায়ক যেন পীড়াদায়ককে গাভীর দুগ্ধ বর্ষপর্যন্ত পান করতে না দেয়। যে সেই অমৃতরূপ দুগ্ধ পান করে নিজেকে তৃপ্ত করতে আকাঙ্ক্ষা করে, সেই পীড়কজনদের অন্যসকলের সম্মুখে তীক্ষ্ণ অস্ত্র দ্বারা যেন তাড়িত করে।।১৭।।


🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৮)


বিষং গবাং যাতুধানাঃ পিবন্ত্বা বৃশ্চ্যন্তামদিতয়ে দুরেবাঃ।

পরৈনান্দেবঃ সবিতা দদাতু পরা ভাগমোষধীনাং জয়ন্তাম।।১৮।।

পদার্থঃ (যাতুধানাঃ) অত্যাচারী (গবাং বিষং পিবন্তু) গো আদি পশুর দুগ্ধ পান করবে না, কিন্তু মূত্র  পান করবে (অদিতয়ে দুরেবাঃ) মাতা-ভগিনীর প্রতি অত্যাচারীর (পরৈঃ-বৃশ্চ্যন্তাম্) ওপর প্রহার দ্বারা ছিন্নভিন্ন করা হোক (দেবঃ-সবিতা-এনান্ পরা দদাতু) রাজা এদের দণ্ডদাতাদের নিকট প্রদান করুক (ঔষধীনাং ভাগং পরা জয়ন্তু) ঔষধিসমূহের অংশকে প্রাপ্ত হোক, অন্য কিছু নয়।।১৮।।

ভাবার্থঃ পীড়া প্রদানকারীকে গাভীর দুগ্ধ যেন প্রদান করা না হয় তাদেল কেবল অন্ন প্রাপ্ত হোক এবং প্রহারপূর্বক শাস্তি যেন পায়।।১৮।।


🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৯) 


সনাদগ্নে মৃণসি যাতুধানান্ন ত্বা রক্ষাংসি পৃতনাসু জিগ্যুঃ।

অনু দহ সহমুরান ক্রব্যাদো মা তে হেত্যা মুক্ষত দৈব্যায়াঃ।।১৯।।

পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (যাতুধানান্) অত্যাচারীদিগকে (সনাৎ-মৃণসি) সর্বদাই তুমি হিংসা করো (রক্ষাংসি ত্বা পৃতনাসু ন জিগ্যুঃ) দুষ্ট রাক্ষসগণ যেন  সংগ্রামে তোমার ওপর জয়ী না হয় (ক্রব্যাদঃ সমুরান্-অনুদহ) মাংসভক্ষকদিগকে সমূলে ধ্বংস করো (তে দৈব্যায়াঃ-হেত্যা মা মুক্ষত) তোমার বিদ্যুৎ দ্বারা যুক্ত প্রহার-শক্তি থেকে তারা যেন মুক্তি লাভ না করে।।১৯।।

ভাবার্থঃ সেনানায়ক এমন হওয়া উচিত, সংগ্রামে  শত্রুজন যেন তাদের ওপর জয়ী না হতে পাড়ে এবং এমন বৈদ্যুতিক অস্ত্র যেন চালনাকারী হয়, যার থেকে কেউ না রক্ষা পেতে পাড়ে।।১৯।।


🔰ঋগ্বেদ (১০/৮৭/২০)


ত্বং নো অগ্নে অধরাদুদক্তাত্তবং পশ্চাদুত রক্ষা পুরস্তাৎ।

প্রতি তে তে অজরাসস্তপিষ্ঠা অবশংসং শোশুচতো দহন্তু।।২০।।

পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (ত্বং নঃ) তুমি আমাদের (অধরাৎ) দক্ষিণ দিশা হতে (উদক্তাৎ) উত্তর দিশা হতে (ত্বং) তুমি (পশ্চাৎ) পশ্চিমদিশা হতে (উত) এবং (পুরস্তাৎ) পূর্ব দিশা হতে (রক্ষ) সুরক্ষিত করো (তে) তোমার (তে-অজরাসঃ) সেই জীর্ণতারহিত স্থির (তপিষ্ঠাঃ) অতি উত্তপ্ত (শোশুচতঃ) দেদীপ্যমান প্রহার (অঘশংসং দহন্তু) যেন পাপের প্রশংসাকারী, পাপী শত্রুকে দগ্ধ করে।।২০।।

ভাবার্থঃ সকল দিশা হতে রক্ষাকারী নায়কের উচিত তার জ্বলন্ত প্রহারের দ্বারা শত্রুকে ধ্বংস করে দেওয়া।।২০।।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

"দূর্জনের ছলের অভাব হয় না"!


ধন্যবাদ

নমস্তে সকলকে!

"সত্যমেব জয়তে" 

★ISDPA★

Tuesday, 6 February 2024

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে কেন ঋষি বলা হয়?



 স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে  কেন ঋষি বলা হয়?

একটি সমীক্ষাঃ

শাস্ত্র সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞানী কিছু ব্যক্তিরা দাবি করছেন যে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে “ঋষি” বলা যাবে না।

সত্যিই কি তাই!

আজকে এই বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

প্রথমে বেদভাষ্যকারদের বেদভাষ্য থেকে দেখে আসি।

★আচার্য্য উব্বট তার শুক্লযজুর্বেদ ভাষ্যের (৭/৪৬) এ লিখেছেন, ঋষিমন্ত্রাণাম্ ব্যাখ্যাতা অর্থাৎ ঋষি মন্ত্রের ব্যাখ্যাকর্তা।


★★একই মন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে মহিধরও লিখেছেন,”ঋষিম্ মন্ত্রাণাম্ ব্যাখ্যাতারম্” অর্থাৎ ঋষিগণ মন্ত্রের ব্যাখ্যাকরেন।


★★★ নিরুক্ত (১৩/১২) অনুসারে “পূর্বকালে ঋষিরা দেবতাদের জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের মধ্যে কারা ঋষি হবে?তাদের দেবতারা বললেন “তর্কই ঋষি” অর্থাৎ মন্ত্রার্থ বিচার করার জন্য যিনি বা যাহারা এক পূর্ণ দেবজ্ঞ(উত্তম গুণ সম্পন্ন) তর্ক করেন তাহারাই আর্ষ বা ঋষি হন।”


★★★★আবার বৌধায়ন গৃহ্যসূত্র (১/৭/৭) এ বলা হয়েছে, “চতুর্বেদাদ্ ঋষি” অর্থাৎ যিনি চতুর্বেদ অধ্যয়ন করেছেন তিনি ঋষি।



আবার স্বামী বিবেকানন্দের মতে,

“আধ্যাত্মিক জগতের সত্য লাভ করিতে হইলে মানুষকে উহার অতীত প্রদেশে, ইন্দ্রিয়ের বাহিরে

যাইতেই হইবে । আর এখনও এমন ব্যক্তি সকল আছেন, যাহারা পঞ্চইন্দ্রিয়ের সীমার বহির্দেশে যাইতে সক্ষম ।ইহাদিগকেই ঋষি বলে কারণ, ইহারা আধ্যাত্মিক সত্য সমূহের সাক্ষাৎকার করিয়া থাকেন।"

দ্রষ্টব্যঃভারতে বিবেকানন্দ,ভারতীয় মহাপুরুষগণ,পৃষ্ঠাঃ(১৬৭-১৬৮)


শুধু তাই নয়,তিনি আরও বলেছেন-

“বন্ধুগণ, যতদিন না তোমাদের প্রত্যেকেই ঋষি হইতেছ,যতদিন না আধ্যাত্মিক সত্য সাক্ষাৎকার করিতেছ। ততদিন তোমাদের ধর্মজীবন আরম্ভ হয় নাই জানিবে।”

দ্রষ্টব্যঃভারতে বিবেকানন্দ,ভারতীয় মহাপুরুষগণ,পৃষ্ঠাঃ১৬৮।



আধুনিক ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায় মহাত্মা  অরবিন্দকেও ঋষি বলা হয় আবার তিনি তার "বঙ্কিম-তিলক-দয়ানন্দ" গ্রন্থে  সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রকেও ঋষি বলেছেন এবং মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর কাজ সম্পর্কে অনেক কিছুই বর্ণনা করেছেন।


বিচারঃ উপরোক্ত প্রমাণাদি হইতে সিদ্ধ হইতেছে যে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে “ঋষি” বলা সম্পূর্ণই সংগত।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

বেদমন্ত্রের দ্রষ্টা না হওয়া সত্ত্বেও মহর্ষি বাল্মীকি এবং মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ (বেদব্যাস) কেও ঋষি বলা হয়।

সত্যমেব জয়তে

★ISDPA★

Mrichachhakam DR SRI NIBAS SASTRI