নমস্তে সকলকে,
"মনুসংহিতা/মনুস্মৃতি" সনাতন ধর্মের স্মৃতি শাস্ত্রগুলোর মধ্যে একটি, মহর্ষি মনু এই গ্রন্থের রচয়িতা।এই মনুস্মৃতিকে নিয়ে সেই অতীতকাল হতে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে এবং বর্তমানে বাংলা ভাষায় যে মনুসংহিতা পাওয়া যায় সেই মনুসংহিতায় অধিকাংশ শ্লোকই প্রক্ষিপ্ত। সেই প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলোকে কাজে লাগিয়ে যবন পার্টির কিছু ধূর্ত উম্মাদ মনুসংহিতা নিয়ে আক্ষেপ তুলেছেন।আজকে কিছু আক্ষেপের নিবারণ করা হবে।
মণ্ডনঃ
প্রথমে জানা যাক, শূদ্র কারা?
"একমের তূ শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশৎ। এতেষামেব বর্ণনাং শুশ্রূষামনসূয়য়া ॥"
মনুসংহিতা (১/৯১)
অনুবাদঃ- নিন্দা, ঈর্ষা এবং অভিমানাদি দোষ পরিত্যাগ করিয়া ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, এবং বৈশ্যদিগকে যথোচিত সেবা করা শূদ্রের কর্তব্য এবং তদ্দ্বারাই জীবন যাত্রা নির্বাহ করা। ইহাই একমাত্র শূদ্রের গুণ এবং কর্ম ॥
আবার মহাভারত বলছে,
শূদ্রধর্মঃ পরো নিত্যম্ শুশ্রুষা চ দ্বিজাতিষু (৫৭)
সশূদ্রঃ সম্পিততপাঃ সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয়ঃ ।
শুশ্রুষুরতিথি প্রাপ্তম্ তপঃ সম্চিনুতে মহত্ (৫৮)
নিত্যম্ স হি শুভাচারো দেবতাদ্বিজপুজকঃ ।
শূদ্রো ধর্মফলৈরিষ্টৈঃ সম্প্ৰয়ুজ্যেত বুদ্ধিমান্। (৫৯)
[মহাভারত অনুশাসন পর্ব, দানধর্ম পর্ব, অধ্যায়ঃ১৪১(৫৭-৫৯), গীতাপ্রেস]
অনুবাদঃ শূদ্রের পরম ধর্ম হল তিন বর্ণের সেবা করা। যে শূদ্র সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়,আর ঘরে আসা বিদ্বান অতিথির সেবাকারী, সে মহান তপের সঞ্চয় করে নেয়। তার সেবারূপ ধর্ম হল তার জন্য কঠোর তপস্যা।নিত্য সদাচার পালন আর ঈশ্বরভক্ত তথা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যকে সম্মানকারী বুদ্ধিমান শূদ্র ধর্মের মনোবাঞ্ছিত ফল প্রাপ্ত করে।
তাহলে বুঝতে পারলাম ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের যারা সেবা করবেন তারাই শুদ্র!
★বর্ণ কি পরিবর্তন করা যায়?
এতৈঃ কর্মফলৈৰ্দেবি ন্যুনজাতিকুলোদ্ভবঃ ।
শূদ্রোপ্যাগমসম্পন্নো দ্বিজো ভবতি সস্কৃতঃ।।
[মহাভারত অনুশাসন পর্ব, দানধর্ম পর্ব(১৪৩/৪৬),গীতাপ্রেস]
অনুবাদঃ দেবী ! এই কর্ম ফলের প্রভাব দ্বারা নীচ জাতি এবং হীন কুলে উৎপন্ন হওয়া শূদ্রও শাস্ত্র জ্ঞান সম্পন্ন আর সংস্কারযুক্ত ব্রাহ্মণ হয়।
★মহাভারতে আরও পাওয়া যায়–
স দ্বিজো বৈশ্যতামেতি বৈশ্যো বা শূদ্ৰতামিয়াত্ ।
স্বধর্মাত্ প্রয়ুতো বিপ্ৰস্ততঃ শূদ্রত্বমাপ্লুতে।।
[মহাভারত অনুশাসন পর্ব, দানধর্ম পর্ব(১৪৩/১১),গীতাপ্রেস]
অনুবাদঃ যদি বৈশ্য শূদ্রের কর্মকে গ্রহণ করে, তাহলে সে শূদ্রত্বকে প্রাপ্ত করে। শূদ্রচিৎ কর্ম করে নিজের ধর্মে ভ্রষ্ট হওয়া ব্রাহ্মণ শূদ্রত্বকে প্রাপ্ত করে।
শূদ্রো ব্রাহ্মণতামেতি ব্রাহ্মণশ্চৈতি শূদ্রতাম্।
ক্ষত্রিয়াজ্জাতমেবং তু বিদ্যাদ্বৈশ্যাত্তথৈব চ।।
মনুসংহিতা (১০/৬৫)
ভাষ্যঃ- (শূদ্রঃ ব্রাহ্মণতাম্ + এতি) শূদ্র ব্রাহ্মণ (চ) আর (ব্রাহ্মণঃ শূদ্রতাম্ + এতি) ব্রাহ্মণ শূদ্র হয়ে যায় অর্থাৎ গুণ কর্ম অনুসারে যদি ব্রাহ্মণ হয় তো ব্রাহ্মণ থাকে তথা যে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রের গুণ ধারণ করে সে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র হয়ে যায়। তেমনি শূদ্রও যদি মূঢ় হয় তো সে শূদ্রই রয় যদি উত্তম গুণযুক্ত হয় তো যথাযোগ্য ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য হয়ে যায়।(ক্ষত্রিয়াত্ জানম্ + এবং তু তথৈব বৈশ্যাত্ বিদ্যাত্) তেমনিই ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের বিষয়কেও জেনো।
উপরোক্ত প্রমাণাদি থেকে জানতে পারলাম শুদ্র এর কর্ম কি এবং শুদ্র চাইলে ব্রাহ্মণও হতে পারবে।
এবার যবনদের চুলাকানির মলম তৈরী করা যাক।
আমরা প্রথমেই বলেছি বর্তমান মনুসংহিতায় অনেক প্রক্ষিপ্ত শ্লোক আছে,সেই প্রক্ষিপ্ততা এবং প্রক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ তুলে ধরে ড.সুরেন্দ্রকুমারজী "বিশুদ্ধ মনুসংহিতা" নামক একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সেই গ্রন্থে তিনি যুক্তি এবং প্রমাণ দ্বারা মনুসংহিতার সঠিক শ্লোকগুলো সিদ্ধ করেন।
প্রথমে যবনদের চুলাকানিগুলো দেখে আসি–
আক্ষেপঃ
১)কারন ঈশ্বর শূদ্রের জন্য একটি কাজই নিদিষ্ট করে দিয়েছে তাহলো ব্রাহ্মণের দাসত্ব করা (মনুসংহিতা ১.৯১)।
২)আমরা হলাম ব্রাহ্মণ সে জন্য আমরা জগতের প্রভু (মনুসংহিতা ১.৯৩)।
৩)আমরা মুসলমানেরা ব্রাহ্মণ আর আমরা সাক্ষাৎ সনাতন ধর্মের মূর্তি (মনুসংহিতা ১.৯৮)
৪)আমরা মুসলমান ব্রাহ্মণেরা শূদ্রদের দাসত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেও শূদ্র দাসত্ব কর্ম থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না (মনুসংহিতা ৮.৪১৪)
৫)আর নমঃশুদ্র গুলো আমাদের দাসত্ব করার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।(মনুসংহিতা ৮.৪১৩)
★প্রথমে(১-৩) নং পয়েন্টগুলো নিয়ে বলা যাক।
শ্লোকগুলো নিম্নরুপ–
১)
একমের তূ শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশৎ।
এতেষামেব বর্ণনাং শুশ্রূষামনসূয়য়া ॥ মনুসংহিতা (১/৯১)
অনুবাদঃনিন্দা, ঈর্ষা এবং অভিমানাদি দোষ পরিত্যাগ করিয়া ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, এবং বৈশ্যদিগকে যথোচিত সেবা করা শূদ্রের কর্তব্য এবং তদ্দ্বারাই জীবন যাত্রা নির্বাহ করা। ইহাই একমাত্র শূদ্রের গুণ এবং কর্ম।
২)
উত্তমাঙ্গোদ্ভবাজ্জ্যৈষ্ঠয়াদ্ ব্রহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ ।
সর্বস্যৈবাস্য সর্গস্য ধর্মতো ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ ॥মনুসংহিতা(১/ ৯৩)
অনুবাদঃ(উত্তম অঙ্গ)অর্থাৎ মুখ হতে উৎপত্তি হওয়ার কারণে চার বর্ণের মধ্যে সর্বপ্রথম উৎপন্ন হওয়ায় এটি সবচেয়ে বড় হওয়ার কারণ এবং বেদকে ধারণ করার কারণে এই সম্পূর্ণ সংসারে ব্রাহ্মণই ধর্মের স্বামী।
৩)
উৎপত্তিরেব বিপ্রস্য মূর্তির্ধর্মস্য শাশ্বতী ।
স হি ধর্মার্থমুৎপন্নো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে ॥মনুসংহিতা(১/৯৮)
অনুবাদঃব্রাহ্মণের জন্মই হয় ধর্মের শাশ্বত মূর্তিরুপে অর্থাৎ তাঁহার শরীরকেই প্রত্যক্ষ ধর্মের মূর্তি মান্যতা কর,কেননা ইহা ধর্ম বৃদ্ধির জন্য উৎপন্ন হয়ে মোক্ষ প্রাপ্তীর অধিকারী হয়।
★১ নং অধ্যায়ের (৯২-১০৭) এই শ্লোকগুলো নিম্নোক্ত কারণে প্রক্ষিপ্ত—
(ক) ৯৪ নং শ্লোকে ব্রহ্মার মুখ হতে ব্রাহ্মণের উৎপত্তি বলা হয়েছে। ৯৩নং শ্লোকেও তাকে “উত্তমাঙ্গোদ্ভব” বলা হয়েছে তথা ৯২ তেও ব্রহ্মার চর্চা আছে। ব্রহ্মার প্রসঙ্গ মৌলিক নয়। এই প্রসঙ্গটি মনুস্মৃতির মান্যতা হতে অনেক প্রকারের বিরোধ আছে। এইজন্য দ্রষ্টব্য হলো–(১/৭-১৩), (৩২-৪১),(৫০-৫১) নং শ্লোকগুলোর উপর সমীক্ষা। এই প্রকারে এই তিনটি শ্লোকও প্রক্ষিপ্ত, এবং শেষ প্রসঙ্গ এই গুলোর সাথে সম্বন্ধ হওয়ার কারণে স্বতঃ প্রক্ষিপ্ত সিদ্ধ হয়ে যাবে।
(খ)মহর্ষি মনু কর্মের ভিত্তিতে বর্ণব্যবস্থা মানতেন,এটার অন্য প্রমাণ ও আছে।শূদ্রকে তিনি হীন মানতেন না কিন্তু 'শুচিঃ' = পবিত্র 'উৎকৃষ্ট শুশ্রূষু' আদি বিশেষণ দ্বারা সম্বোধিত করেন।(৯/৩৩৫)
সবার ঘরে সব প্রকারের সেবা কারী ব্যক্তি কীভাবে অপবিত্র, অশুচি বা হীন হতে পারে?
(গ) মহর্ষি মনু কর্মের ভিত্তিতেই ব্যক্তিকে শ্রেষ্ঠ = আর্য এবং অশ্রেষ্ঠ = অনার্য মানতেন।(১০/৫৭-৫৮) তে তিনি কর্মের আধারে তাদেরকে চিনতে বলেন। এই সব উক্তি মনুর কর্মের ভিত্তিতে বর্ণব্যবস্থাকে মান্যতা করাকে সিদ্ধ করে।
(ঘ)(১/৩১) নং শ্লোকেও মহর্ষি মনু নিজের "কর্মণা বর্ণব্যবস্থা" মান্যতার সংকেত দিয়েছেন।(১/১৬,২৩,২৫-৩০) দ্বারা ইহাই বলা যায় যে,একসাথে অনেক প্রজা উৎপন্ন হয়েছে—ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য এবং শূদ্রগণ রুপে প্রজা উৎপন্ন হয় নি অর্থাৎ সমান মনুষ্যের রুপেই হয়েছে।আবার সেই অনেক মনুষ্যের মধ্যে হতে সমাজের বৃদ্ধির জন্য এক ব্যবস্থা রুপে চার বর্ণকে মুখ,বাহু,পেট এবং পা এর সাম্যতা হতে(গুণকর্মানুসার) নির্মাণ করেছেন।(১/৩১) এ অলংকারিক রুপে এই কথন আছে।উক্ত অঙ্গের যে স্থান এবং কার্য শরীরে আছে,সমাজে ঐ স্থানই ক্রমশ ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য এবং শুদ্র তৈরী করেছে।এই প্রকারে যোগ্যতাকে আধার করে মনুষ্যকে চার বর্ণে বিভক্ত করে তাদের কর্মও সেই অনুসারে নিশ্চিত করেছেন।এই প্রকার অনেক প্রমাণ দ্বারা "কর্মণা বর্ণব্যবস্থা" মহর্ষি মনুর মৌলিক মান্যতা সিদ্ধ হয়।অতএব ইহার বিরোধী "জন্মনা বর্ণব্যবস্থা" এই মান্যতা অন্তর্বিরোধের উপর আধারিত হওয়ায় প্রক্ষিপ্ত বলা যায়।এই মান্যতার বিষয়ে (১/৩১,৮৭-৯১),(২/১১),(১০/৬৫) এর সমীক্ষাও দ্রষ্টব্য।
(ঙ)মহর্ষি মনু কর্মের ভিত্তিতে মানুষের দুইটি শ্রেণী মানেন। (১) যারা শ্রেষ্ঠ ধর্মানুকুল আর্য পরম্পরায় দীক্ষিত, শূদ্রসহ তারা চার বর্ণই আর্য। (২) এখানে অদীক্ষিত বাকি সবাই দস্যু।(১০/৪৫)
(চ)এই প্রকার ৯৪-৯৫ নং শ্লোকে পিতরদের পৃথক যোনি বিশেষ কোন রূপে মান্য করাও মহর্ষি মনু বিরোধী মান্যতা হয়।এইজন্য বিস্তৃত সমীক্ষা দেখুন–(৩/১১৯–২৮৪) শ্লোকের মধ্যে 'অন্তবিরোধ' শীর্ষক।এই অন্ত বিরোধের কারণে (৯৪–৯৫) নং শ্লোক প্রক্ষিপ্ত সিদ্ধ হয়। শেষ পূর্বাপর প্রসঙ্গের সম্বন্ধ হওয়ার কারণে স্বতঃ প্রক্ষিপ্ত বলা যাবে।
(ছ)১০৫ নং শ্লোকে পূর্বাপর এর সাথে গৌড়িয়দের পবিত্রতা মানা হয়েছে।ইহা(৪/২৪০) এর মান্যতার বিরোধ, কেননা সেখানে কর্তাকে স্বয়ং ফলের ভোক্তা মানা হয়েছে। যদি এক ব্যক্তি মনুস্মৃতিকে পড়ে পূর্বাপরের সাথে-সাথে গৌড়িয়দের পবিত্র করে নেয় তাহলে গৌড়িয়দের মনুস্মৃতিকে পড়ার কী আবশ্যকতা আছে? তাদের জীবন তো এক অধ্যেতায় পবিত্র করে দিয়েছে। এই অন্ত বিরোধের কারণে ১০৫ নং শ্লোক প্রক্ষিপ্ত। শেষ পূর্বাপর শ্লোকের সাথে সম্বন্ধিত, অতঃপর সাথে রচনা হওয়াতে এইটাও স্বতঃ প্রক্ষিপ্ত বলা যাবে।
★এবার (৪-৫) নং পয়েন্ট নিয়ে বলা যাক—
শ্লোকগুলো নিম্নরুপ—
৪)
ন স্বামিনা নিসৃষ্টোঽপি শূদ্রো দাস্যাদ্বিমুচ্যতে ।
নিসর্গজং হি তত্তস্য কস্তস্মাৎ তদপোহতি ॥মনুসংহিতা(৮/৪১৪)
অনুবাদঃ- শূদ্র স্বামী দ্বারা ত্যাগ করার পরও দাসত্ব হতে মুক্ত হয় না।দাসতার কার্য করা তার স্বাভাবিক ধর্ম,দাসত্ব থেকে তাকে কে মুক্ত করতে পারে?অর্থাৎ কেউ নয়!
৫)
শূদ্রং তু কারয়েদ্ দাস্যং ক্রীতমক্রীতমেব বা।
দাস্যায়ৈব হি সৃষ্টোঽসৌ ব্রাহ্মণস্য স্বয়ম্ভুবা ॥মনুসংহিতা(৮/৪১৩)
অনুবাদঃ- ক্রয় করে নিয়ে এসে অথবা বেতন দিয়ে রেখে শুদ্র দ্বারা দাস্য কার্য করান,কেননা ব্রহ্মা ব্রাহ্মণের দাসতার জন্যই শূদ্রকে রচনা করেছেন।
(মলম)খণ্ডনঃ
★৮নং অধ্যায়ের(৪১০-৪২০) নং শ্লোকগুলো নিম্ন প্রকারে প্রক্ষীপ্ত-
১)বিষয়বিরোধঃ-মহর্ষি মনু দ্বারা নির্ধারিত ১৮ ব্যবহারের বর্ণনা হতে বাহ্য হওয়ার কারণে এই বৈশ্য-শূদ্র বিষয়ক শ্লোক বিষয়বিরুদ্ধ,অতএব প্রক্ষিপ্ত। বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য(৮/৩৯০-৩৯৭) এর উপর আধারিত সমীক্ষা।
২)প্রসঙ্গবিরোধঃ-(ক)মহর্ষি মনুর নিজের লিখিত বিষয়সংকেত শ্লোকগুলো(৮/৪-৭) অনুসারে ১৮ ব্যবহারের নির্ণয় এর সমাপ্তি (৯/২৫০) এই শ্লোকে হয়। ব্যবহারের সমাপ্তি হওয়ার পূর্বেই (৪১৯-৪২০) শ্লোকে সকল ব্যবহারের সমাপ্তি এবং ইহার ফলের কথন করা অসঙ্গত।
(খ)বৈশ্য,শূদ্রের কর্মের প্রসঙ্গ(৯/৩২৬-৩৩৫),(১০/১-১০) এ আছে,সেখানে এটি প্রসঙ্গবিরুদ্ধ।
৩) অন্তর্বিরোধঃ-(ক)( ৪১২–৪২৮) নং শ্লোকে দাস প্রথার উল্লেখ রয়েছে এবং তাদের দিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানোর বিধানও রয়েছে। এই প্রথা মহর্ষি মনুর বিরুদ্ধ। কাজ করানোর বদলে মহর্ষি মনু পারিশ্রমিক দেওয়ার বিধান করেছেন (৮/২১৪–২১৬)।মহর্ষি মনুর ব্যাবস্থায় দাসদের ‘অস্তিত্বই’ নেই, যেখানেই দাস শব্দটি থাকুক না কেন তার অর্থ হলো ‘সেবক’ (৪/১৮০)। উনারা শূদ্রবর্ণ মেনেছিলেন ও তাদের সেবা কার্য নির্ধারণ করেছেন এবং তাও জোরপূর্বক নয় বরং দ্বিজাতিদের সেচ্ছায় সেবা করার অধিকার শূদ্রদের দেওয়া হয়েছে। (১/৯১),( ৯/৩৩৪–৩৩৫),(১০/৯৯)।
(খ) ৪১৬ বা (৫/১৫০) এবং( ৯/১১৪,১৩০,১৩১) আদি বিরুদ্ধ,যেখানে কন্যা ও স্ত্রীদের সম্পত্তিতে অধিকার মানা হয়েছে। এই অন্তর্বিরোধ এর ভিত্তিতে এই শ্লোকও প্রক্ষিপ্ত।
(৪) শৈলীগত ভিত্তিঃ-এই শ্লোকের শৈলী মহর্ষি মনুর শৈলীর মতো নির্লিপ্ত এবং সমভাবাপন্ন না হয়ে পক্ষপাত, দুরাচার এবং ঘৃণাযুক্ত হয়েছে । এই ভিত্তিতেও এটি মহর্ষি মনু প্রণিত সিদ্ধ হয় না। এই প্রক্ষীপ্ত শ্লোকগুলোতে ব্রাহ্মণদের কর্তব্য পালন না করার জন্যও কোন শাস্তি লেখা হয় নি, যেখানে অন্যত্র কর্তব্য ত্যাগ এবং অপরাধ করার জন্য ব্রাহ্মণদের অন্য সকল বর্ণের চেয়ে অধিক শাস্তির বিধান রয়েছে। অতঃপর এই অসংগতির কারণে এই শ্লোকও প্রক্ষিপ্ত।
বিশেষঃ- এই শ্লোকগুলোকে স্থান ভ্রষ্ট না মেনে প্রক্ষিপ্ত এই কারণে মানা হয়েছে যে,
(১) বিষয় বিরোধের সাথে সাথে অন্য ‘ভিত্তিতে’ও প্রক্ষিপ্ত প্রমানিত হয়।
(২) এই অধ্যায়ে এই শ্লোকগুলোর মধ্যে সম্মন্ধযুক্ত কোন প্রসঙ্গই নেই, যেখান থেকে খন্ডিত মেনে একে স্থান ভ্রষ্ট মানা যাবে।
বিচারঃ
বর্তমানে মনুসংহিতায় প্রাপ্ত(১/৯২-১০৭) এবং (৮/৪১০-৪২০) এই শ্লোকগুলো প্রক্ষীপ্ত হওয়ার কারণে গ্রহণীয় নয়।তাই এই শ্লোকগুলো দেখিয়ে মানুষকে মূর্খ(মুমিন) বানানো বোকামী।মুমিনদের ব্রাহ্মণ বললে "ব্রাহ্মণ" শব্দটিরই অপমান করা হবে,কারণ তারা সঠিক সিদ্ধান্তে শুদ্রই হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
কুয়োই বসবাসকারী ব্যাঙ সমুদ্রের বিশালতা কল্পনাও করতে পারে না।
"সত্যমেব জয়তে"
★ISDPA★


No comments:
Post a Comment