বেদে কি সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের বিধান দেওয়া হয়েছে?
ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৮) মন্ত্রে কি সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের বিধান দেওয়া হয়েছে?
একদল স্বল্পজ্ঞানী বিধর্মীর দাবি ঋগ্বেদের উক্ত মন্ত্রে সাধারণ মনুষ্যদের গোমূত্র পানের কথা বলা হয়েছে। আসুন তাদের এরূপ ভুল ধারণার নিবারণ করা যাক। ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৮৭ নং সূক্তের মন্ত্রগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যেসকল অত্যাচারীরা বা যাতনাধারকেরা মানুষ হত্যা করে, অশ্বদিগকে হত্যা করে, গো আদি পশুকে হত্যা করিয়া তাদের মাংস ভক্ষণ করে নিজের শরীর পুষ্ট করে পাশাপাশি গাভীর দুগ্ধ হরণ করে, দূষণ ও নষ্ট করে তাদেরকে গাভীর দুগ্ধ নয় বরং গাভীর মূত্র তথা বিষ ভক্ষণ করতে বলেছে। আর যারা অত্যাচারী নয়, মানুষ, অশ্ব ও গো আদি পশুকে হত্যা করে না, গাভীর দুগ্ধ নষ্ট করে না তাদের গাভীর উত্তম দুগ্ধ পান করতে বলেছে। ঋগ্বেদ ১০ মণ্ডল ৮৭ তম সূক্তের ১৫ থেকে ২০ নং মন্ত্রের অনুবাদ তুলে দেওয়া হলো অপপ্রচারকদের উপস্থাপিত স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক জীর ভাষ্য হতে -
প্রথমেই সুক্তের ১নং মন্ত্রটি দেখা প্রয়োজন।
🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১)
সূক্তটির বিষয় বস্তু: এই সূক্তে রাষ্ট্রধ্বংসক শত্রুদের তথা প্রজাপীড়কদের বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্রের দ্বারা নাশ করার বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
রক্ষোহণং বাজিনমা জিঘর্মি মিত্রং প্রথিষ্ঠমুপ যামি শর্ম।
শিশানো অগ্নিঃ ক্রতুভিঃ সমিদ্ধঃ স নো দিবা স রিষঃ পাত নক্তম্।।১।।
পদার্থঃ (রক্ষোহণং বাজিনম) যার থেকে রক্ষা করা উচিত, সেই রাক্ষস স্বভাবযুক্ত পাপী শত্রুকে যে হত্যা করে, সেই বলবান (মিত্রং প্রথিষ্ঠং জিঘর্মি) অস্ত্রপ্রেরক অতিশক্তিপ্রসারক আগ্নেয়াস্ত্রযুক্তকে আমি রাজা দীপ্ত করেছি, প্রবুদ্ধ করেছি, জ্ঞনোপদেশ প্রদান করছি (শর্ম-উপ যামি) এরূপ করে সুখকে প্রাপ্ত হই (সঃ) সেই (শিশানঃ-অগ্নিঃ) তীক্ষ্ণ বলবিশিষ্ট অগ্রণী সেনানায়ক (ক্রতুভিঃ-সমিদ্ধঃ) যিনি বিবিধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগের দ্বারা সংসিদ্ধ (নঃ) আমাদের (সঃ-রিষঃ-দিবানক্তং পাতু) সেই হিংসক শত্রু হতে দিন-রাত রক্ষা করার মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখুক।।১।।
ভাবার্থঃ রাজার এমন সেনানায়ক তৈরি করা উচিত, যে শত্রুকে দমন ও বধ করতে পূর্ণ সমর্থ আগ্নেয়াস্ত্র প্রভৃতি চালনাকারী হয়।
এবার এই সুক্তের অর্থাৎ (১০/৮৭) সুক্তের (১৫-২০) নং মন্ত্র পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেখা যাক—
🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৫)
পরাদ্য দেবা বৃজিনং শৃণন্তৃ প্রত্যগেনং শপথা যন্তু তৃষ্টাঃ।
বাচাস্তেনং শরব ঋচ্ছন্ত মর্মন্বিশ্বস্যৈতু প্রসিতিং যাতুধানঃ।।১৫।।
পদার্থঃ (দেবাঃ) বিজয়াভিলাষী যুদ্ধকুশল স্বপক্ষীয় সৈনিকজন বা বৈদ্যুতিক রশ্মি পদার্থ অস্ত্রপ্রযুক্ত (বৃজিনম্-অদ্য পরা শৃণন্তু) অন্যদের প্রাণসংহারকারী পাপীদেরকে শীঘ্রই নষ্ট করো (তৃষ্টাঃ-শপথাঃ-এনং প্রত্যক্-এতু) প্রাণপোষক অহিতকর প্রলাপ ঐ পাপীর দিকেই গমন করুক বা তাকেই আঘাত করুক (শরবঃ) হিংসক বাণ (বাচা স্তেনং-মর্মন্-ঋচ্ছন্তু) বাণীর দ্বারা অপহরণকর্তার মর্মস্থান প্রাপ্ত হোক (যাতুধানঃ-বিশ্বস্য প্রসিতিম্-এতু) অত্যাচারী সমগ্র রাষ্ট্রের বন্ধনকে প্রাপ্ত হোক।।১৫।।
ভাবার্থঃ সৈনিকজন বা অস্ত্রে প্রযুক্ত বিদ্যুৎ আদি পদার্থ পাপীকে নষ্ট করুক, অপরের প্রতি [উচ্চারিত] মর্মভেদী অপশব্দ উল্টো তাকেই নাশ করুক, সমগ্র রাষ্ট্রের পীড়াদায়ক বন্ধনে তাকে পতিত করা হোক৷।১৫।।
🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৬)
যঃ পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা সমংক্তে যো অশ্ব্যেন পশুনন যাতুধানঃ।
যো অঘ্ন্যায়া ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ।।১৬।।
পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (যঃ-যাতুধানঃ) যেসকল অত্যাচারী দুষ্ট প্রাণী (পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা) মানুষের অভ্যন্তরীণ মাংসের দ্বারা (সমঙক্তে) নিজেকে পুষ্ট করে (যঃ-অশ্ব্যেন পশুনা) যে পশুদের মধ্যে সাধু পশুদের দ্বারা নিজেকে সম্যক পুষ্ট করে (যঃ-অঘ্ন্যায়াঃ ক্ষীরং ভরতি) যে অহন্তব্য বা হত্যার অযোগ্য গাভীর দুগ্ধ হরণ করে-দূষিত করে (তেষাং শীর্ষাণি হরসা বৃশ্চ) তাহার মস্তককে বা তাহার মস্তকতূল্য বর্তমান প্রমুখজনদিগকে হরণকারক অস্ত্র-শস্ত্র সাধন দ্বারা ছিন্নভিন্ন করো, নষ্ট করো।।১৬।।
ভাবার্থঃ তেজস্বী নায়কের উচিত রাষ্ট্রতে, যে পীড়া প্রদানকারী প্রাণী মানুষের মাংস ভক্ষণ করে নিজেকে পুষ্ট করে বা উত্তম অশ্বদের নষ্ট করে, গাভীর দুগ্ধ হরণ করে, দূষিত করে, তাদের মস্তক এবং তার প্রমুখজনদেরকে নষ্ট করো ।।১৬।।
🔰ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৭)
সংবৎসরীণং পয় উস্রিয়ায়াস্তস্য মাশীদাত্যাতুধানো নৃচক্ষঃ।
পীয়ুষমগ্নে যতমস্তিতৃপ্সাত্তং প্রত্যঞ্চমর্চিষা বিধ্য মর্মন্।।১৭।।
পদার্থঃ (নৃচক্ষঃ-অগ্নে) হে মনুষ্যের কর্মদ্রষ্টা নায়ক! (যাতুধানঃ) পীড়াদায়ক দুষ্ট মনুষ্য (উস্রিয়ায়াঃ-সংবৎসরীণং তস্য পয়ঃ) গাভীর সেই দুগ্ধকে বর্ষপর্যন্ত-পুরো বর্ষ জুড়ে (মা-অশীৎ) যেন পান করতে না পারে, এরূপ দণ্ড তাকে দেও (পীয়ুষং যতমঃ-তিতৃপ্সাৎ) সেই অমৃতরূপ দুগ্ধের দ্বারা যে [পীড়াদায়ক মনুষ্য] নিজেকে পুষ্ট করতে প্রয়াসী হয়, (তং প্রত্যঞ্চম্) তাকে সকলের প্রত্যক্ষ-সম্মুখে (অর্চিষা মর্মন্ বিধ্য) জ্বলন্ত শিখাদ্বারা তার মর্ম বিদ্ধ করে-তাড়িত করো।।১৭।।
ভাবার্থঃ সকলের আচার-ব্যবহার রূপ কর্মের দ্রষ্টা নায়ক যেন পীড়াদায়ককে গাভীর দুগ্ধ বর্ষপর্যন্ত পান করতে না দেয়। যে সেই অমৃতরূপ দুগ্ধ পান করে নিজেকে তৃপ্ত করতে আকাঙ্ক্ষা করে, সেই পীড়কজনদের অন্যসকলের সম্মুখে তীক্ষ্ণ অস্ত্র দ্বারা যেন তাড়িত করে।।১৭।।
🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৮)
বিষং গবাং যাতুধানাঃ পিবন্ত্বা বৃশ্চ্যন্তামদিতয়ে দুরেবাঃ।
পরৈনান্দেবঃ সবিতা দদাতু পরা ভাগমোষধীনাং জয়ন্তাম।।১৮।।
পদার্থঃ (যাতুধানাঃ) অত্যাচারী (গবাং বিষং পিবন্তু) গো আদি পশুর দুগ্ধ পান করবে না, কিন্তু মূত্র পান করবে (অদিতয়ে দুরেবাঃ) মাতা-ভগিনীর প্রতি অত্যাচারীর (পরৈঃ-বৃশ্চ্যন্তাম্) ওপর প্রহার দ্বারা ছিন্নভিন্ন করা হোক (দেবঃ-সবিতা-এনান্ পরা দদাতু) রাজা এদের দণ্ডদাতাদের নিকট প্রদান করুক (ঔষধীনাং ভাগং পরা জয়ন্তু) ঔষধিসমূহের অংশকে প্রাপ্ত হোক, অন্য কিছু নয়।।১৮।।
ভাবার্থঃ পীড়া প্রদানকারীকে গাভীর দুগ্ধ যেন প্রদান করা না হয় তাদেল কেবল অন্ন প্রাপ্ত হোক এবং প্রহারপূর্বক শাস্তি যেন পায়।।১৮।।
🔰 ঋগ্বেদ (১০/৮৭/১৯)
সনাদগ্নে মৃণসি যাতুধানান্ন ত্বা রক্ষাংসি পৃতনাসু জিগ্যুঃ।
অনু দহ সহমুরান ক্রব্যাদো মা তে হেত্যা মুক্ষত দৈব্যায়াঃ।।১৯।।
পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (যাতুধানান্) অত্যাচারীদিগকে (সনাৎ-মৃণসি) সর্বদাই তুমি হিংসা করো (রক্ষাংসি ত্বা পৃতনাসু ন জিগ্যুঃ) দুষ্ট রাক্ষসগণ যেন সংগ্রামে তোমার ওপর জয়ী না হয় (ক্রব্যাদঃ সমুরান্-অনুদহ) মাংসভক্ষকদিগকে সমূলে ধ্বংস করো (তে দৈব্যায়াঃ-হেত্যা মা মুক্ষত) তোমার বিদ্যুৎ দ্বারা যুক্ত প্রহার-শক্তি থেকে তারা যেন মুক্তি লাভ না করে।।১৯।।
ভাবার্থঃ সেনানায়ক এমন হওয়া উচিত, সংগ্রামে শত্রুজন যেন তাদের ওপর জয়ী না হতে পাড়ে এবং এমন বৈদ্যুতিক অস্ত্র যেন চালনাকারী হয়, যার থেকে কেউ না রক্ষা পেতে পাড়ে।।১৯।।
🔰ঋগ্বেদ (১০/৮৭/২০)
ত্বং নো অগ্নে অধরাদুদক্তাত্তবং পশ্চাদুত রক্ষা পুরস্তাৎ।
প্রতি তে তে অজরাসস্তপিষ্ঠা অবশংসং শোশুচতো দহন্তু।।২০।।
পদার্থঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক! (ত্বং নঃ) তুমি আমাদের (অধরাৎ) দক্ষিণ দিশা হতে (উদক্তাৎ) উত্তর দিশা হতে (ত্বং) তুমি (পশ্চাৎ) পশ্চিমদিশা হতে (উত) এবং (পুরস্তাৎ) পূর্ব দিশা হতে (রক্ষ) সুরক্ষিত করো (তে) তোমার (তে-অজরাসঃ) সেই জীর্ণতারহিত স্থির (তপিষ্ঠাঃ) অতি উত্তপ্ত (শোশুচতঃ) দেদীপ্যমান প্রহার (অঘশংসং দহন্তু) যেন পাপের প্রশংসাকারী, পাপী শত্রুকে দগ্ধ করে।।২০।।
ভাবার্থঃ সকল দিশা হতে রক্ষাকারী নায়কের উচিত তার জ্বলন্ত প্রহারের দ্বারা শত্রুকে ধ্বংস করে দেওয়া।।২০।।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
"দূর্জনের ছলের অভাব হয় না"!
ধন্যবাদ
নমস্তে সকলকে!
"সত্যমেব জয়তে"
★ISDPA★

No comments:
Post a Comment